
নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় দিয়ে প্রতিকূলতা পেরিয়ে সফল ফ্রিল্যান্সার হয়েছেন মিতু আক্তার। একসময় ভাঙা ল্যাপটপ নিয়ে শুরু করা তাঁর পথচলা এখন একটি এজেন্সি পরিচালনা এবং অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জীবনের প্রতিকূলতা অনেক সময় মানুষের স্বপ্নকে থমকে দেয়। পারিবারিক সংকট, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা সামাজিক বাধা হয়ে দাঁড়ায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে। তবে দৃঢ় মনোবল ও নিরলস প্রচেষ্টা থাকলে সেই বাধা পেরিয়েও নতুন করে জীবন গড়া সম্ভব। মিতু আক্তারের জীবনসংগ্রাম তেমনই এক উদাহরণ।
একসময় কোলে ছোট সন্তান, হাতে একটি পুরোনো ও ভাঙা ল্যাপটপ আর সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। সেই অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে। গড়ে তুলেছেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘বি মার্কেটিং এজেন্সি’। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন প্রায় ১০ জন তরুণ-তরুণী।
মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার বেজগাঁও গ্রামে মিতু আক্তারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তাঁর বাবা মো. আবুল হোসেন শেখ পেশায় একজন সার্ভেয়ার বা আমিন। মা শিউলি বেগম। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট এবং পরিবারের একমাত্র মেয়ে মিতু।
২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে বিয়ে হয় তাঁর। পরের বছর, ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর জন্ম নেয় তাঁর একমাত্র ছেলে সাফাত নূর আলিফ।
কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে সংকট। ২০১৯ সালের দিকে পারিবারিক টানাপোড়েনের একপর্যায়ে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পরিস্থিতি তৈরি হয়। তখন কোলে মাত্র ছয় মাসের সন্তান। নিজের ও সন্তানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার চ্যালেঞ্জও সামনে এসে দাঁড়ায়।
নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তাগিদে ঘরে বসে করা যায়—এমন কাজের সন্ধান শুরু করেন মিতু। ২০২০ সালের শেষ দিকে ভাইয়ের একটি পুরোনো ল্যাপটপ অনেক অনুরোধ করে নেন। ল্যাপটপটি মেরামত করে গ্রাফিক ডিজাইন শেখার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু বিচ্ছেদের পর শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরার পথে ল্যাপটপটি আবার নষ্ট হয়ে যায়। এতে নতুন করে বিপাকে পড়েন তিনি।
এ সময় মায়ের সহযোগিতা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মিতু প্রথম আলোকে বলেন, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটি কোর্স করার জন্য মায়ের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছিলেন তিনি। মেয়ে ও নাতির ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁর মা নিজের কানের দুল বিক্রি করে সেই টাকা তুলে দেন মিতুর হাতে। মায়ের সেই আত্মত্যাগ তাঁকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগায়।
এরপর এসইও (সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন) ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য মনোযোগ দিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। ভর্তি হন ক্রিয়েটিভ আইটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে। আর্থিক সংকট ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শেখার আগ্রহ ধরে রাখেন।
একপর্যায়ে ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম ফাইভারে এক ইতালীয় গ্রাহকের কাছ থেকে ১২০ ডলারের প্রথম কাজ পান তিনি। সেই কাজ ছিল তাঁর পেশাগত যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। ধীরে ধীরে কাজের অভিজ্ঞতা ও গ্রাহকসংখ্যা বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে ফাইভারে লেভেল-২ এবং আপওয়ার্কে টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার হিসেবে স্বীকৃতি পান।
ব্যক্তিগতভাবে কাজ করার পাশাপাশি একসময় প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নেন মিতু। একজন অংশীদারকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বি মার্কেটিং এজেন্সি’। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ১০ জন তরুণ-তরুণী দূর থেকে কাজ করছেন।
এজেন্সিটির কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে এসইও, ডিজিটাল মার্কেটিং ও গ্রাফিক ডিজাইন। আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে অন্যদের কাজের সুযোগও তৈরি করছেন তিনি।
মিতুর এই পথচলা শুধু আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প নয়; বরং সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও কীভাবে নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, তারও একটি উদাহরণ।
সন্তান লালন-পালন ও পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও অসমাপ্ত পড়াশোনা শেষ করার সিদ্ধান্ত নেন মিতু। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ প্রোগ্রামে পড়াশোনা করছেন।
মিতুর ভাষ্য, জীবনের কঠিন সময় তাঁকে নিজের ভেতরের শক্তি চিনতে সাহায্য করেছে। একসময় অনেকে তাঁকে দিয়ে কিছু হবে না বলে মন্তব্য করলেও তিনি চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কাজের সূত্রে প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে তাঁর। তবু সেসব বাধা তাঁকে থামাতে পারেনি।
তিনি জানান, মায়ের বিক্রি করে দেওয়া কানের দুল নিজের উপার্জনের টাকায় আবার তৈরি করে দিয়েছেন। নিজের আয়ে একটি স্কুটি কিনেছেন, গাড়ি চালানো শিখে ড্রাইভিং লাইসেন্সও সংগ্রহ করেছেন। পাশাপাশি নিজের জমানো টাকায় জমি কিনেছেন এবং ভবিষ্যতে সেখানে বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন।
মিতু আরও বলেন, বিচ্ছেদের পর বাবার বাড়িতে ফিরে না গিয়ে নিজেই বাসা ভাড়া নিয়ে ছেলেকে সঙ্গে রেখে জীবন পরিচালনা করেছেন। বর্তমানে তাঁর একমাত্র সন্তান তাঁর কাছেই রয়েছে এবং সন্তানের দায়িত্বও নিজেই পালন করছেন।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মিতু মনে করেন, ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ডিজিটাল মার্কেটিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনা ও সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের মতো দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ঘরে বসেও আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব।
তবে এ ক্ষেত্রে ধৈর্য, নিয়মিত অনুশীলন এবং নতুন প্রযুক্তি ও কৌশল শেখার আগ্রহ থাকা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। নিজের দক্ষতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ক্রিয়েটিভ আইটির প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন মিতু।
এখন তাঁর লক্ষ্য ব্যক্তিগত সাফল্যের গণ্ডি পেরিয়ে অন্য নারীদের জন্য কাজ করা। পারিবারিক বা সামাজিক বাধার কারণে যাঁরা পিছিয়ে রয়েছেন, তাঁদের ফ্রিল্যান্সিংয়ের মৌলিক দক্ষতা শেখানো এবং আত্মবিশ্বাসী করে তোলার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছেন তিনি।
ভাঙা ল্যাপটপ দিয়ে শুরু হওয়া মিতু আক্তারের পথচলা দেখিয়েছে, প্রতিকূলতা থাকলেও শেখার আগ্রহ, পরিশ্রম ও সুযোগের সদ্ব্যবহার একজন মানুষকে সামনে এগিয়ে নিতে পারে। নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার মধ্য দিয়ে তিনি এখন আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন—যে স্বপ্নের কেন্দ্রে রয়েছে নারীর দক্ষতা, আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা।