সোমবার, ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
পল্লবী থানার ভেতরে ককটেল বিস্ফোরণ, ঢাকাজুড়ে আতঙ্ক ভুটান-শ্রীলঙ্কার ড্রয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবহারে বিশ্বে শীর্ষে ফিলিস্তিন, বাংলাদেশের অবস্থান কত? দেবিদ্বারে বিএনপির দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি সমাবেশ, গাড়ি ভাঙচুর এক ছেলেকে কবর দিয়ে ফিরেই ছোট ছেলের লাইফ সাপোর্টের সামনে বাবা নওগাঁয় ডিবির অভিযানে ২ কেজি গাঁজাসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের যুবক গ্রেপ্তার মালয়েশিয়ায় বিনা খরচে চাকরি, লটারিতে বাছাই ৩০০ বাংলাদেশি রাষ্ট্রদ্রোহে জড়িতদের তালিকা হচ্ছে, কেউ ছাড় পাবেন না: মন্ত্রী চাকরি খুঁজে হতাশ? হজরত মূসা (আ.)-এর এই দোয়ায় চান কল্যাণ গোপালগঞ্জ জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

একই প্রশ্নে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েও ফলের এত পার্থক্য, দায় কি শুধু শিক্ষার্থীদের?

  • Update Time : রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ৯.৩৪ এএম
  • ১৬ Time View
23

এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু ফল প্রকাশের পর বোর্ডভেদে পাসের হারে দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ, অন্যদিকে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। দুই বোর্ডের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ১৭ শতাংশ পয়েন্ট। একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়েও ফলে এত পার্থক্য কেন, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, শিক্ষক সংকট, ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে দুর্বলতা, শহর ও গ্রামের শিক্ষার সুযোগের পার্থক্য, অভিভাবকের সম্পৃক্ততা এবং শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক পরিবেশ ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। এবার ইংরেজি ও আইসিটিতে তুলনামূলক দুর্বল ফলও সামগ্রিক ফলকে প্রভাবিত করেছে। তবে বিষয়টি শুধু শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।

অভিন্ন প্রশ্নপত্রের পাশাপাশি পরীক্ষাকেন্দ্রের পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। পরীক্ষার হলের পরিবেশ এবং হল গার্ডের দায়িত্ব পালনের মান কি সব শিক্ষা বোর্ডে একই? কোথাও নজরদারি কঠোর, কোথাও তুলনামূলক শিথিল হলে পরীক্ষার পরিবেশে পার্থক্য তৈরি হতে পারে। এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পরীক্ষার্থীদের ওপর পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের পাশাপাশি পরীক্ষাকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনাও তুলনামূলকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও বোর্ডভেদে কোনো পার্থক্য তৈরি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার উদ্দেশ্য যদি সারা দেশের শিক্ষার্থীদের একটি অভিন্ন মানদণ্ডে যাচাই করা হয়, তাহলে উত্তরপত্র মূল্যায়নেও যথাসম্ভব অভিন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। একই উত্তরের জন্য একজন পরীক্ষক তুলনামূলক বেশি নম্বর দিলে এবং অন্যজন কম দিলে শিক্ষার্থীর ফল পরীক্ষকের মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।

এ ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলকভাবে আন্তঃবোর্ড মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো বোর্ডের উত্তরপত্র শুধু সেই বোর্ডের পরীক্ষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্য বোর্ডের পরীক্ষকদের মাধ্যমেও মূল্যায়ন করা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের নির্দিষ্টসংখ্যক উত্তরপত্র অন্য বোর্ডের পরীক্ষকদের দিয়ে মূল্যায়ন করানো যেতে পারে। একইভাবে যশোরসহ অন্যান্য বোর্ডের উত্তরপত্রও সংশ্লিষ্ট বোর্ডের বাইরের পরীক্ষকদের মাধ্যমে মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

পুরো ব্যবস্থাটি একবারে পরিবর্তন না করে প্রথমে নির্দিষ্টসংখ্যক উত্তরপত্র নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই পদ্ধতি চালু করা সম্ভব। পরে প্রচলিত ও আন্তঃবোর্ড মূল্যায়নের ফল তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। এতে কোনো বোর্ডের মূল্যায়ন তুলনামূলক কঠোর বা উদার কি না, তা বোঝার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় মূল্যায়ন পদ্ধতির সম্ভাব্য প্রভাব কমবে এবং পরীক্ষক ও বোর্ডের মধ্যে জবাবদিহি বাড়তে পারে।

তবে আন্তঃবোর্ডে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন অভিন্ন মার্কিং স্কিম, একাধিক গ্রহণযোগ্য উত্তরের নমুনা, পরীক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মূল্যায়ন পর্যালোচনা। বিশেষ করে যেসব প্রশ্নের একাধিক গ্রহণযোগ্য উত্তর হতে পারে, সেসব ক্ষেত্রে পরীক্ষকদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি। নমুনা উত্তর ও নম্বর প্রদানের পদ্ধতিও আগে থেকে নির্ধারণ করা যেতে পারে।

প্রয়োজনে নির্দিষ্টসংখ্যক উত্তরপত্র দ্বিতীয় পরীক্ষকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করে দুই পরীক্ষকের নম্বরের পার্থক্য বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেলে তৃতীয় পরীক্ষকের মাধ্যমে যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।

বোর্ডভিত্তিক ফলের গভীর বিশ্লেষণ এখন জরুরি। শুধু কোন বোর্ডে কত শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে, সেই তথ্য যথেষ্ট নয়। কোন বিষয়ে কতজন অকৃতকার্য হয়েছে, কোন প্রশ্নে শিক্ষার্থীরা বেশি ভুল করেছে, প্রশ্নভিত্তিক নম্বরের বণ্টন কেমন ছিল এবং পরীক্ষকভেদে নম্বর প্রদানের পার্থক্য কতটুকু—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা, হল গার্ডের দায়িত্ব পালন এবং পরীক্ষার পরিবেশ সম্পর্কেও বোর্ডভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে।

শিক্ষকদের দায়িত্ব শুধু পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা নয়, প্রকৃত শিক্ষা নিশ্চিত করা। শিক্ষার্থী যেন মুখস্থনির্ভর না হয়ে বিষয়টি বুঝে উত্তর দিতে পারে, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় ব্যক্তিগত ধারণা বা নিজস্ব পছন্দের পরিবর্তে নির্ধারিত মূল্যায়ন মানদণ্ড অনুসরণ করা প্রয়োজন।

অভিভাবকদেরও শুধু জিপিএ বা পাসের হার দিয়ে সন্তানের শিক্ষার মান বিচার করা উচিত নয়। সন্তান কী শিখেছে, কোন বিষয়ে দুর্বল এবং কোথায় তার ঘাটতি রয়েছে, সেটি বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

সবশেষে মনে রাখা দরকার, কম পাসের হার মানেই শিক্ষা ব্যবস্থা খারাপ, আবার বেশি পাসের হার মানেই শিক্ষা ব্যবস্থা ভালো—এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষার্থী তার অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার ভিত্তিতে ন্যায্যভাবে মূল্যায়িত হয়েছে কি না।

অভিন্ন প্রশ্নপত্র যদি জাতীয় মানদণ্ডের প্রথম ধাপ হয়, তাহলে অভিন্ন, নির্ভরযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক মূল্যায়ন ব্যবস্থা হওয়া উচিত পরবর্তী ধাপ। এবারের ফলকে তাই শুধু কে কত শতাংশ পাস করল, সেই হিসাব হিসেবে না দেখে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে নতুন করে পর্যালোচনার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। একই প্রশ্নে পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীর মূল্যায়নের মানদণ্ডও যতটা সম্ভব একই হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা ব্যবস্থার ন্যায্যতার প্রশ্নটি এখানেই।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

fd43f8d18c7312b2a8b90a5edc5903e9
© All rights reserved © 2026