গ্রাহকসেবায় এআই বিপ্লব, রবি চালু করল ভয়েসবট; কথা বলেই জানা যাবে বিল ও অফারের তথ্য
মোবাইল ফোনের গ্রাহকসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু করেছে দেশের অন্যতম মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটা পিএলসি। গ্রাহকদের দ্রুত সেবা দিতে ‘Robi Verbex VoiceBOT Solution’ চালুর জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ছয় মাসের পরীক্ষামূলক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। নতুন এই ব্যবস্থায় গ্রাহকেরা স্বাভাবিক কথোপকথনের মাধ্যমে বিল, চার্জ, লোন, ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস এবং বিভিন্ন অফার সম্পর্কে তথ্য জানতে পারবেন। ফলে সাধারণ সেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে মানব গ্রাহকসেবা প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন কমবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিটিআরসির সাম্প্রতিক কমিশন সভায় রবিকে এই পরীক্ষামূলক অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। অনুমোদন অনুযায়ী, Verbex নামের প্রযুক্তি সরবরাহকারীর সঙ্গে Managed Service Arrangement-এর আওতায় ভয়েসবটটি পরিচালিত হবে। এর প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর একটি অংশ Google Cloud Platform (GCP)-এ পরিচালিত হবে। ফলে সেবার কিছু তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত ক্লাউড অবকাঠামোর মাধ্যমে সম্পন্ন হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় বেশ কিছু কঠোর শর্ত দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
রবির প্রধান করপোরেট ও রেগুলেটরি কর্মকর্তা শাহেদ আলম বাসসকে জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে সেবাটি চালু করেছে এবং গ্রাহকেরা এর সুবিধা পেতে শুরু করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় সাধারণ সেবার জন্য গ্রাহকদের আর দীর্ঘ সময় ধরে কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হবে না। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁরা দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা পাবেন।
নতুন ভয়েসবট মূলত গ্রাহকের দৈনন্দিন মোবাইল সেবাসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চার্জসংক্রান্ত তথ্য, বিলের বিবরণ, লোন ব্যবস্থাপনা, ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস এবং বিভিন্ন অফার কেনার বিষয়ে সহায়তা পাওয়া যাবে। প্রচলিত স্বয়ংক্রিয় ফোন মেনুতে সাধারণত নির্দিষ্ট নম্বর চেপে একের পর এক বিকল্প নির্বাচন করতে হয়। কিন্তু এআইভিত্তিক ভয়েসবট স্বাভাবিক কথোপকথনের মাধ্যমে গ্রাহকের প্রশ্ন বুঝে উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। ফলে ব্যবহারকারীর জন্য সেবা নেওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ হতে পারে।
তবে বিদেশি ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবহারের কারণে গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ সতর্কতা আরোপ করেছে বিটিআরসি। অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী, গ্রাহকের মোবাইল নম্বর বা MSISDN সরাসরি বিদেশি ক্লাউডে পাঠানো যাবে না। প্রয়োজন হলে নম্বরের পরিচয় গোপন করতে Pseudonymisation এবং Encryption পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সময় গ্রাহকের প্রকৃত পরিচয় যেন সহজে শনাক্ত করা না যায়, সে ব্যবস্থা রাখতে হবে।
গ্রাহকের পূর্ণাঙ্গ কল ডিটেইল রেকর্ডস বা Call Detail Records (CDR) দেশের বাইরে পাঠানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইভাবে গ্রাহকের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ঠিকানা এবং বায়োমেট্রিক তথ্যের মতো সরাসরি পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম ব্যক্তিগত তথ্য বিদেশে স্থানান্তর বা সংরক্ষণ করা যাবে না। ভয়েসবটের মাধ্যমে কোনো গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই বা আদান-প্রদানের প্রয়োজন হলে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাটি থেকে কল মানব গ্রাহকসেবা প্রতিনিধির কাছে স্থানান্তর করতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা। গ্রাহকের তথ্য কোনো Large Language Model (LLM)-এর প্রশিক্ষণ বা Fine-tuning-এর কাজে ব্যবহার করা যাবে না। সেবা দেওয়ার সময় প্রয়োজনীয় তথ্য সাময়িকভাবে প্রক্রিয়াকরণ করা গেলেও তা সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে এআই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এর ফলে গ্রাহকের কথোপকথন ও ব্যক্তিগত তথ্যকে এআই প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত থাকবে।
গ্রাহকের সম্মতির বিষয়টিও অনুমোদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী, গ্রাহকের স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া ভয়েসবট সেবা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যাবে না। কোনো গ্রাহক চাইলে কথোপকথনের যেকোনো পর্যায়ে এআই ব্যবস্থা থেকে সরাসরি মানব গ্রাহকসেবা প্রতিনিধির কাছে যেতে পারবেন। অর্থাৎ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু হলেও মানব প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ বন্ধ করা যাবে না।
এ ছাড়া ভয়েসবট ব্যবহারের সংশ্লিষ্ট লগ অন্তত দুই বছর সংরক্ষণ করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরীক্ষা ও তদারকির জন্য সিস্টেম উন্মুক্ত রাখতে হবে। বিটিআরসি প্রয়োজন মনে করলে যেকোনো সময় এই ব্যবস্থার কার্যক্রম পর্যালোচনা করতে পারবে। অনুমোদনের শর্ত ভঙ্গ হলে পরীক্ষামূলক অনুমতি স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতাও কমিশনের হাতে রাখা হয়েছে।
বিটিআরসির এই অনুমোদন বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গ্রাহকসেবা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষ করে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের কল ও সেবার অনুরোধ সামলাতে মোবাইল অপারেটরদের জন্য স্বয়ংক্রিয় কথোপকথন ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। সাধারণ প্রশ্নের উত্তর এআই দিতে পারলে মানব গ্রাহকসেবা প্রতিনিধিরা জটিল অভিযোগ, ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই এবং বিশেষ সেবার বিষয়গুলোতে বেশি সময় দিতে পারবেন।
তবে নতুন প্রযুক্তির সাফল্য শুধু দ্রুত উত্তর দেওয়ার ওপর নির্ভর করবে না। এআই গ্রাহকের কথা কতটা সঠিকভাবে বুঝতে পারছে, বাংলার আঞ্চলিক ভাষা ও উচ্চারণ শনাক্ত করতে পারছে কি না, ভুল তথ্য দিচ্ছে কি না এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত মানব প্রতিনিধির কাছে সংযোগ দিতে পারছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিল, চার্জ ও লোনসংক্রান্ত তথ্য ভুলভাবে দেওয়া হলে গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।
ছয় মাসের পরীক্ষামূলক অনুমোদনের সময় এসব বিষয় পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকবে। পরীক্ষার ফলাফল, গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা এবং তথ্য সুরক্ষার শর্ত যথাযথভাবে পালনের ওপর ভবিষ্যতে সেবাটির বিস্তৃতি ও ধারাবাহিকতা নির্ভর করতে পারে। গ্রাহকসেবায় এআই ব্যবহারের নতুন এই উদ্যোগ একদিকে সেবা পাওয়ার সময় কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্বও বাড়িয়েছে।