শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ

  • Update Time : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১০.০০ এএম
  • ১৯ Time View
27

বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সেনাবাহিনীর ভেতরে ঘটে যাওয়া বিদ্রোহ ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। একই দিন নিহত হন ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা। এ ঘটনাপ্রবাহ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথেও প্রভাব ফেলে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। এরপর ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। ওই সময় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। একই সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে।

৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে অস্থিরতা আরও বাড়ে। ৬ নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরদিন ৭ নভেম্বর ভোরে সেনাবাহিনীর নিম্নপদস্থ সদস্যদের বিদ্রোহ শুরু হয়। এই বিদ্রোহের সঙ্গে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সংশ্লিষ্টতার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে। বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হন। অন্যদিকে খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দার নিহত হন।

৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে কর্নেল আবু তাহেরের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জাসদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহ সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার কথা বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তবে ওই দিনের বিদ্রোহের উদ্দেশ্য, নেতৃত্ব এবং জিয়াউর রহমান ও আবু তাহেরের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।

ঘটনার পর জিয়াউর রহমান সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনামলে বহুদলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সম্প্রসারিত হয় এবং অর্থনৈতিক নীতিতেও পরিবর্তন আসে। তবে তাঁর ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া, সামরিক শাসনের ভূমিকা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

৭ নভেম্বরের তাৎপর্য বুঝতে হলে ওই দিনের ঘটনাকে শুধু একজন ব্যক্তির উত্থান কিংবা একটি রাজনৈতিক দলের বিজয় হিসেবে দেখলে পুরো ইতিহাস বোঝা যায় না। এ দিন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সৈনিকদের অসন্তোষ, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল একই সঙ্গে সামনে এসেছিল। বিদ্রোহের পর সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়। বিভিন্ন বিবরণে ওই সময় সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর হামলা ও প্রাণহানির কথাও উঠে এসেছে।

৭ নভেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও ভিন্ন। বিএনপি দিনটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। জাসদ একে ‘সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে দেখে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা-সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। অর্থাৎ একই ঘটনাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করে।

সব মিলিয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণ। এ দিনের ঘটনাপ্রবাহে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায়, জিয়াউর রহমানের উত্থানের পথ তৈরি হয় এবং পরবর্তী কয়েক বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। তাই ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে ঘটনাটির সব পক্ষের ভূমিকা, প্রাণহানি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

fd43f8d18c7312b2a8b90a5edc5903e9
© All rights reserved © 2026