
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ মূল্যতথ্য ও আঞ্চলিক তুলনায় দেখা যাচ্ছে, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য বাংলাদেশি ভোক্তাদের সবচেয়ে বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। দেশে নভেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা। অথচ প্রতিবেশী ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় সমপরিমাণ গ্যাসের আনুমানিক দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় এর চেয়ে কম।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত ২ নভেম্বর নভেম্বর মাসের জন্য এলপিজির নতুন মূল্য ঘোষণা করে। এতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নতুন দাম ওই দিন রাত ৮টা থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আগে অক্টোবর মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়েছিল। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে এই সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে মোট ৪৭৫ টাকা।
বিইআরসির ঘোষণা অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে বেসরকারি পর্যায়ে বিক্রি হওয়া এলপিজির খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অক্টোবর মাসে এই দাম ছিল ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা। নতুন মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম, সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইস, আমদানি ও পরিবহন ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খরচ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। বিইআরসি জানিয়েছে, নির্ধারিত দাম ভ্যাটসহ খুচরা পর্যায়ের ভোক্তামূল্য।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের ভোক্তাদের ওপর এলপিজির ব্যয়ের চাপ আরও স্পষ্ট হয়। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক মূল্যতথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে ১১ দশমিক ৮ কেজি গৃহস্থালি এলপিজি সিলিন্ডারের নভেম্বরের নির্ধারিত সর্বোচ্চ দাম ৩ হাজার ৪৭০ দশমিক ০৯ পাকিস্তানি রুপি। ১২ কেজি গ্যাসের সমপরিমাণ হিসাব করলে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর দাম আনুমানিক ১ হাজার ৫৮৩ টাকার কাছাকাছি।
শ্রীলঙ্কায় লিট্রো গ্যাসের ১২ দশমিক ৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম নভেম্বর মাসে অপরিবর্তিত রেখে ৪ হাজার ৩৬৫ শ্রীলঙ্কান রুপি নির্ধারণ করা হয়েছে। ১২ কেজি গ্যাসের সমপরিমাণ হিসাব করলে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর দাম আনুমানিক ১ হাজার ৫৬৭ টাকা। দেশটিতে ৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭৫০ রুপি এবং ২ দশমিক ৩ কেজির দাম ৮১৫ রুপি রাখা হয়েছে।
নেপালে গৃহস্থালি কাজে বহুল ব্যবহৃত ১৪ দশমিক ২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ নেপালি রুপি বলে সাম্প্রতিক মূল্যতথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ১২ কেজি গ্যাসের সমপরিমাণ হিসাব করলে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর দাম আনুমানিক ১ হাজার ৪২৬ টাকা। অন্যদিকে ভারতের কলকাতায় ১৪ দশমিক ২ কেজি গৃহস্থালি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৯৬৮ ভারতীয় রুপি। ১২ কেজির সমপরিমাণ গ্যাসের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ১ হাজার ৭২ টাকা।
এই তুলনায় বাংলাদেশের ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর সমপরিমাণ গ্যাসের আনুমানিক দামের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তবে দেশগুলোর প্রচলিত সিলিন্ডারের ওজন এক নয়। কোথাও ১১ দশমিক ৮ কেজি, কোথাও ১২ দশমিক ৫ কেজি, আবার কোথাও ১৪ দশমিক ২ কেজির সিলিন্ডার বেশি ব্যবহৃত হয়। তাই প্রকৃত তুলনার জন্য প্রতি কেজি গ্যাসের দাম অথবা সমপরিমাণ ১২ কেজির দাম হিসাব করা হয়েছে। বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশি মুদ্রায় রূপান্তরিত অঙ্কও কিছুটা ওঠানামা করতে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে সাধারণ গৃহস্থালি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এবং নির্দিষ্ট যোগ্য পরিবারের জন্য ভর্তুকির পর কার্যকর দাম এক নয়। ফলে ভারতের ভর্তুকিপ্রাপ্ত সিলিন্ডারের সঙ্গে বাংলাদেশের বেসরকারি বাজারের খুচরা মূল্য সরাসরি তুলনা করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। একইভাবে পাকিস্তানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওজিআরএ নির্ধারিত দাম সর্বোচ্চ ভোক্তামূল্য হিসেবে কার্যকর হলেও বাস্তব বাজারে কোথাও কোথাও এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। সংস্থাটি প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রোপেন ও বিউটেনের মূল্য এবং অন্যান্য ব্যয়ের ভিত্তিতে নতুন দাম ঘোষণা করে। সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইসকে এ ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নভেম্বর মাসের মূল্য নির্ধারণে প্রোপেনের প্রতি টনের দাম ৭২০ মার্কিন ডলার এবং বিউটেনের দাম ৭৮০ মার্কিন ডলার ধরা হয়েছে। ৩৫ শতাংশ প্রোপেন ও ৬৫ শতাংশ বিউটেনের মিশ্রণ বিবেচনায় গড় আন্তর্জাতিক মূল্য হিসাব করা হয়েছে প্রতি টন ৭৫৯ ডলার।
দেশে এলপিজির দাম বেশি হওয়ার পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যই দায়ী কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। আমদানিনির্ভরতা, জাহাজ ভাড়া, বন্দর ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ অবকাঠামো, পরিবহন ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার এবং বাজার ব্যবস্থাপনার খরচ চূড়ান্ত মূল্যকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের এলপিজি সরবরাহের বড় অংশ বেসরকারি আমদানিকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে কিংবা ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তিত হলে তার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ে।
দেশে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ সীমিত হওয়া এবং অনেক এলাকায় নতুন সংযোগ না পাওয়ায় রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। শহরের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও অসংখ্য পরিবার এখন সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করছে। ফলে এলপিজির দাম বাড়লে সাধারণ পরিবারের মাসিক ব্যয়ও বেড়ে যায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এদিকে বিইআরসি নির্ধারিত দাম এবং বাস্তবে বাজারে ভোক্তাদের কাছ থেকে নেওয়া দামের মধ্যেও পার্থক্যের অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়া, পরিবহন বা সরবরাহের নামে অতিরিক্ত টাকা দাবি এবং এলাকাভেদে দামের তারতম্য নিয়ে ভোক্তাদের অসন্তোষ রয়েছে। ফলে শুধু মূল্য নির্ধারণ করলেই বাজারে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয় না; পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা ও বিপণন পর্যায়ে নিয়মিত তদারকিও প্রয়োজন।
নভেম্বর মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণের পর ভোক্তাদের প্রত্যাশা, নির্ধারিত দামে যেন সারা দেশে গ্যাস পাওয়া যায়। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় ও বিপণন খরচের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দূর করার দাবি উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তার সুফল দ্রুত ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোও জরুরি।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক তুলনায় বাংলাদেশের এলপিজির দাম বেশি হওয়ায় বিষয়টি শুধু মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; দেশের জ্বালানি বাজারের ব্যয় কাঠামো, আমদানি ব্যবস্থাপনা ও ভোক্তা সুরক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে কেন একই পরিমাণ গ্যাসের জন্য বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে, তার কারণ অনুসন্ধান এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ রান্নার জ্বালানি এখন লাখো পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের অংশ। এই ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখা না গেলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন সীমিত আয়ের মানুষ।
সম্পাদক : নূর আলম শেখ
ঠিকানা: ফরিদ মিয়া কমপ্লেক্স, মুকসুদপুর, গোপালগঞ্জ।
ইমেইল : ajkerjagaran@gmail.com
news@ajkerjagaran.com
Copyright © 2026 আজকের জাগরণ All rights reserved.