
আত্মঘাতী বোমা হামলা, গৃহযুদ্ধ ও নিরাপত্তাহীনতার পরিচিতি পেছনে ফেলে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুকে নতুনভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে কাজ করছেন স্থানীয় তরুণী সুদি। ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশি, সোনালি বালুর সৈকত, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পর্যটকদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন তিনি। তাঁর উদ্যোগে সোমালিয়া সম্পর্কে পর্যটকদের দীর্ঘদিনের নেতিবাচক ধারণাও বদলাতে শুরু করেছে।
সুদির ভাষায়, মোগাদিশুর সৈকত ও বালিয়াড়ি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। এখানকার বালিয়াড়ি দেখে অনেকের সাহারা মরুভূমির কথা মনে পড়ে। তবে তাঁর ভ্রমণ আয়োজন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পর্যটকদের নিয়ে যান স্থানীয় মাছের বাজারেও। সেখানে সোমালিয়ার দীর্ঘ উপকূলজুড়ে পাওয়া বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ সম্পর্কে জানতে পারেন তাঁরা।
শহরের ঐতিহাসিক এলাকাও ঘুরিয়ে দেখান সুদি। একসময় ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল মোগাদিশু। শহরের স্থাপত্য ও সংস্কৃতিতে উসমানীয় ও ইতালীয় শাসনামলের প্রভাব এখনো দেখা যায়। ভ্রমণের অংশ হিসেবে পর্যটকেরা সোমালিয়ার উটের মাংস, সামুচা ও ঐতিহ্যবাহী চায়ের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পান।
সুদি জানান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ শুনে অনেক পর্যটক সোমালিয়ায় আসেন। কিন্তু বাস্তবে দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানুষের আতিথেয়তা দেখে তাঁরা বিস্মিত হন। বিশেষ করে মাছের বাজারে সামুদ্রিক মাছের বৈচিত্র্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
শখের বশে শুরু করলেও এখন কাজটিকে ভালোবেসে ফেলেছেন সুদি। বাবার পাশাপাশি অন্য পর্যটন গাইডদের সঙ্গেও কাজ করছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্রমণের ভিডিও প্রকাশ করে সোমালিয়ার সৌন্দর্য তুলে ধরছেন। বিশেষ করে টিকটকে তাঁর ভিডিওর মাধ্যমে দেশটির ভিন্ন চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাচ্ছে। ভবিষ্যতে ইংরেজিতেও কনটেন্ট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
১৯৯১ সালে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের পতনের পর কয়েক দশক ধরে গৃহযুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছে মোগাদিশু। ২০১১ সালে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-শাবাব শহরের অধিকাংশ এলাকা থেকে সরে যাওয়ার পর এবং ২০১২ সালে ফেডারেল সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে পরিবর্তন শুরু হয়। প্রবাসী সোমালীয়, স্থানীয় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের উদ্যোগে শহরে নতুন হোটেল, রেস্তোরাঁ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসন গড়ে উঠেছে। তবে নিরাপত্তাঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
দেশটির পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সোমালিয়ায় প্রায় ১০ হাজার পর্যটক গিয়েছিলেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। মোগাদিশুতে পর্যটকদের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তাচৌকির মুখোমুখি হতে হয় এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও থাকে। তবে সুদির দাবি, সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত পরিস্থিতির সঙ্গে পর্যটকদের বাস্তব অভিজ্ঞতার অনেক পার্থক্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা ক্রিস রিসও দুবার মোগাদিশু ঘুরেছেন। প্রথমবার একা গিয়ে ভালো অভিজ্ঞতা হওয়ায় দ্বিতীয়বার বন্ধুদের নিয়ে সেখানে যান তিনি। শহরের আবহাওয়া, খাবার, সৈকত ও মরুভূমির সৌন্দর্য তাঁকে মুগ্ধ করেছে। একইভাবে রোমানিয়ার পর্যটক মিহায়েলা পাতাপও সোমালিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানুষের আন্তরিকতার প্রশংসা করেছেন।
সুদির লক্ষ্য, বিস্ফোরণ ও সংঘাতের খবরের বাইরে পর্যটকদের কাছে অন্য এক সোমালিয়াকে তুলে ধরা। তাঁর মতে, দেশটিতে পর্যটনশিল্পের বিকাশে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে প্রতিটি পর্যটকের আগমন মোগাদিশুর নতুন গল্প বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি সুযোগ।
সম্পাদক : নূর আলম শেখ
ঠিকানা: ফরিদ মিয়া কমপ্লেক্স, মুকসুদপুর, গোপালগঞ্জ।
ইমেইল : ajkerjagaran@gmail.com
news@ajkerjagaran.com
Copyright © 2026 আজকের জাগরণ All rights reserved.