
হাইড্রোজেন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চলছে ভারতের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত যাত্রীবাহী ট্রেন। এতে প্রচলিত ডিজেল ইঞ্জিন কিংবা রেললাইনের ওপর বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের প্রয়োজন হয় না। ট্রেনের ভেতরেই বিশেষ জ্বালানি কোষের মাধ্যমে হাইড্রোজেন থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, যা চালায় ট্রেনের বৈদ্যুতিক মোটর। ফলে চলার সময় সরাসরি কার্বন ডাই-অক্সাইড বা ডিজেলের ধোঁয়া নির্গত হয় না।
ভারতের হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত রেলপথে গত ১৭ জুলাই ‘নমো গ্রিন রেল’ নামে ১০ কোচের এই ট্রেনের চলাচল শুরু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রেনটিতে দুটি হাইড্রোজেনচালিত ড্রাইভিং পাওয়ার কার এবং আটটি যাত্রীবাহী কোচ রয়েছে। এর সম্মিলিত বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ কিলোওয়াট।
হাইড্রোজেন থেকে কীভাবে চলে ট্রেন
হাইড্রোজেন সরাসরি ট্রেনের চাকা ঘোরায় না। ট্রেনের ভেতরে থাকা বিশেষ জ্বালানি কোষ বা ফুয়েল সেলের মাধ্যমে হাইড্রোজেনের রাসায়নিক শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়। এরপর সেই বিদ্যুৎ বৈদ্যুতিক মোটরে সরবরাহ করা হলে মোটর ঘুরে ট্রেনের চাকা চালায়।
এ প্রক্রিয়ায় ট্রেনের জ্বালানি ট্যাংকে সংরক্ষিত হাইড্রোজেনের সঙ্গে বাতাস থেকে নেওয়া অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। ফুয়েল সেলের ভেতরে হাইড্রোজেন থেকে ইলেকট্রন আলাদা হয়ে বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরি করে। অন্যদিকে প্রোটন বিশেষ পর্দা অতিক্রম করে অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ, পানি ও তাপ।
অর্থাৎ, প্রক্রিয়াটি সংক্ষেপে এমন—
হাইড্রোজেন + অক্সিজেন → বিদ্যুৎ + পানি + তাপ।
এ কারণে হাইড্রোজেন ট্রেনকে একধরনের বৈদ্যুতিক ট্রেন বলা যায়। পার্থক্য হলো, সাধারণ বৈদ্যুতিক ট্রেন রেললাইনের ওপরের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন থেকে শক্তি নেয়। আর হাইড্রোজেন ট্রেন নিজের জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
ব্যাটারি কেন ব্যবহার করা হয়
ফুয়েল সেল বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও ট্রেনের সঙ্গে ব্যাটারি রাখা জরুরি। কারণ ট্রেন চলার সব পর্যায়ে সমান পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু, গতি বাড়ানো কিংবা উঁচু পথে চলার সময় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। আবার নির্দিষ্ট গতিতে চলার সময় তুলনামূলক কম শক্তি লাগে।
ফুয়েল সেল সাধারণত ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। কিন্তু হঠাৎ বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে ব্যাটারি অতিরিক্ত শক্তি জোগায়। ভারতের ট্রেনটিতে ফুয়েল সেলের পাশাপাশি লিথিয়াম ফেরো ফসফেট বা এলএফপি ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া ট্রেন ব্রেক করার সময় পুনরুৎপাদনশীল ব্রেকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে গতিশক্তির একটি অংশ বিদ্যুতে রূপান্তর করা সম্ভব। সেই বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে জমা রেখে পরে ব্যবহার করা যায়। এতে জ্বালানির কার্যকর ব্যবহার বাড়ে।
কোথা থেকে আসে হাইড্রোজেন
হাইড্রোজেন ট্রেনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস ট্রেনের ভেতরে তৈরি হয় না। এ জন্য আলাদা উৎপাদন, সংরক্ষণ ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা প্রয়োজন।
হরিয়ানার জিন্দে ভারতীয় রেলওয়ে এই ট্রেনের জন্য বিশেষ হাইড্রোজেন উৎপাদন ও সরবরাহকেন্দ্র তৈরি করেছে। সেখানে তড়িৎ বিশ্লেষণ বা ইলেক্ট্রোলাইসিস পদ্ধতিতে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন তৈরি করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়।
উৎপাদিত হাইড্রোজেন উচ্চ চাপে সংকুচিত করে বিশেষ ট্যাংকে সংরক্ষণ করা হয়। জিন্দের স্থাপনাটিতে একসঙ্গে প্রায় ৩ হাজার কেজি হাইড্রোজেন সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে গ্যাস সর্বোচ্চ ৫০০ বার চাপে রাখা হয় এবং ট্রেনের ট্যাংকে ৩৫০ বার চাপে সরবরাহ করা হয়।
সাধারণ গাড়িতে জ্বালানি ভরার মতো মনে হলেও হাইড্রোজেন সরবরাহের এই প্রক্রিয়ায় বিশেষ সরঞ্জাম, উচ্চচাপের ট্যাংক এবং কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন। ট্রেনের সিলিন্ডার থেকে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলে পৌঁছায়। সেখানেই তা বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়।
কতটা নিরাপদ হাইড্রোজেন ট্রেন
হাইড্রোজেন অত্যন্ত দাহ্য গ্যাস। বাতাসের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশলে এতে আগুন ধরে যেতে পারে। উচ্চ চাপে সংরক্ষণের কারণেও এর ব্যবহার ও সরবরাহে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
তবে যথাযথ প্রকৌশল ও নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে হাইড্রোজেন ব্যবহার নিরাপদ করা সম্ভব। এ জন্য ট্রেনটিতে গ্যাসের লিক, অতিরিক্ত তাপ, আগুন ও ধোঁয়া শনাক্ত করার সেন্সর বসানো হয়েছে। রয়েছে উন্নত বায়ু চলাচলব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করার প্রযুক্তি এবং সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা।
কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাইড্রোজেনের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কারণ হাইড্রোজেনের অণু অত্যন্ত ছোট হওয়ায় সামান্য ফাঁক দিয়েও গ্যাস বেরিয়ে যেতে পারে। তাই লিক দ্রুত শনাক্ত করা এবং বিপজ্জনক মাত্রায় গ্যাস জমার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতীয় রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, জিন্দের হাইড্রোজেন সংরক্ষণ ও সরবরাহকেন্দ্রটি ভারতের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভস সেফটি অর্গানাইজেশনের অনুমোদন পেয়েছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুসরণ করেও স্থাপনাটির নিরাপত্তা যাচাই করা হয়েছে।
পরিবেশের জন্য কতটা উপকারী
হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল দিয়ে ট্রেন চলার সময় সরাসরি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয় না। ডিজেল ইঞ্জিনের মতো ধোঁয়াও তৈরি হয় না। ফুয়েল সেলের প্রধান উপজাত পানি ও তাপ। এ কারণে পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে প্রযুক্তিটি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে ট্রেন চলার সময় দূষণ না হলেই পুরো প্রক্রিয়াটি শতভাগ পরিবেশবান্ধব হয়ে যায় না। কারণ হাইড্রোজেন উৎপাদনেও শক্তি প্রয়োজন। পানি ভেঙে হাইড্রোজেন তৈরির জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎ যদি সৌর বা বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, তাহলে উৎপাদিত হাইড্রোজেনকে গ্রিন হাইড্রোজেন বলা হয়।
অন্যদিকে, হাইড্রোজেন উৎপাদনে কয়লা বা প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হতে পারে। এ ছাড়া হাইড্রোজেন সংকুচিত করা, সংরক্ষণ ও পরিবহনের ক্ষেত্রেও শক্তি ব্যয় হয়।
তাই হাইড্রোজেন ট্রেনের প্রকৃত পরিবেশগত সুবিধা নির্ভর করে জ্বালানি উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও ব্যবহার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার ওপর। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ দিয়ে হাইড্রোজেন উৎপাদন করা গেলে পরিবেশগত সুবিধা আরও বাড়তে পারে।
কেন সব ডিজেল ট্রেনের বিকল্প নয়
হাইড্রোজেনচালিত ট্রেনকে প্রচলিত বৈদ্যুতিক ট্রেনের চেয়ে সব ক্ষেত্রে উন্নত বিকল্প বলা যায় না। যেসব রেলপথে আগে থেকেই বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন রয়েছে, সেখানে সরাসরি বিদ্যুৎ ব্যবহার করাই সাধারণত বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর।
কারণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে হাইড্রোজেন তৈরি, তা সংকুচিত ও সংরক্ষণ এবং পরে ফুয়েল সেলের মাধ্যমে আবার বিদ্যুতে রূপান্তরের প্রতিটি ধাপে শক্তির অপচয় হয়। ফলে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ সরাসরি ব্যবহার করলে তুলনামূলক বেশি শক্তি পাওয়া সম্ভব।
তবে যেসব রেলপথে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন কঠিন বা ব্যয়বহুল, সেখানে হাইড্রোজেন ট্রেন কার্যকর বিকল্প হতে পারে। বিশেষ করে কিছু আঞ্চলিক, কম ব্যবহৃত ও দুর্গম রেলপথে এ প্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতীয় রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ব্রডগেজ রেলপথের ৯৯ শতাংশের বেশি ইতিমধ্যে বিদ্যুতায়িত হয়েছে। ফলে হাইড্রোজেন ট্রেন দিয়ে পুরো রেলব্যবস্থা প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা নেই। বরং নির্দিষ্ট কিছু রুটে ডিজেলচালিত ট্রেনের বিকল্প হিসেবে এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে।
তবে গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদনের উচ্চ ব্যয়, বিশেষায়িত ট্রেন নির্মাণ, জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্র স্থাপন এবং নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব বিষয় সমাধান করতে পারলেই প্রযুক্তিটির বিস্তারের সুযোগ তৈরি হবে।
ট্রেনটির গতি ও সক্ষমতা কত
ভারতের হাইড্রোজেন ট্রেনটির দুটি ড্রাইভিং পাওয়ার কারের প্রতিটির ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ কিলোওয়াট। সব মিলিয়ে ট্রেনটির বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ কিলোওয়াট। ট্রেনটির নকশাগত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার হলেও জিন্দ-সোনিপত রুটে এর পরিচালনগত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার।
১০ কোচের ট্রেনটিতে রয়েছে আটটি যাত্রীবাহী কোচ। ভারতের রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এতে প্রায় ২ হাজার ৬০০ যাত্রী বহনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে যাত্রী ধারণক্ষমতা ও পরিচালনগত গতি রুট এবং সেবার ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
ভারতীয় রেলওয়ের ২৫ জুলাই প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৭ জুলাই চলাচল শুরুর পর ট্রেনটি ১ হাজার ২০০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করেছে। এতে ৩ হাজার ২০০ লিটারের বেশি ডিজেল সাশ্রয় হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির রেল মন্ত্রণালয়।
ভবিষ্যতে আরও রুটে চলবে কি
ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দেশটির রেলব্যবস্থায় এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করা। শুধু ট্রেন তৈরি নয়, এর জন্য হাইড্রোজেন উৎপাদন, সংরক্ষণ, উচ্চচাপে সংকুচিত করা এবং ট্রেনে জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামোও গড়ে তোলা হয়েছে।
জিন্দ-সোনিপত রুটে পরিচালনার অভিজ্ঞতা অন্য রেলপথে হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কাজে লাগবে। ভারতীয় রেলওয়ে জানিয়েছে, এই প্রকল্পের পরবর্তী পর্যায়ে দিল্লি রুটেও পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে প্রযুক্তিটি এখনো বিকাশের পর্যায়ে। এর ব্যাপক ব্যবহার নির্ভর করবে পরিচালনগত নির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানির দাম, নিরাপত্তা এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে কম-কার্বনযুক্ত হাইড্রোজেন উৎপাদনের সক্ষমতার ওপর।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রেল যোগাযোগ মূলত ডিজেল ইঞ্জিনে জ্বালানি পুড়িয়ে অথবা বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন থেকে শক্তি সংগ্রহ করে পরিচালিত হচ্ছে। হাইড্রোজেন ট্রেন এই ব্যবস্থার বাইরে নতুন একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এতে ট্রেন নিজেই জ্বালানি বহন করবে এবং চলার সময় সেটিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করবে।
ভারতের রেলপথে হাইড্রোজেন ট্রেন ভবিষ্যতে কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করছে প্রযুক্তিটির অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হাইড্রোজেন উৎপাদনের সক্ষমতার ওপর।
সূত্র: ভারতের রেল মন্ত্রণালয়, প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো, দ্য প্রিন্ট, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
সম্পাদক : নূর আলম শেখ
ঠিকানা: ফরিদ মিয়া কমপ্লেক্স, মুকসুদপুর, গোপালগঞ্জ।
ইমেইল : ajkerjagaran@gmail.com
news@ajkerjagaran.com
Copyright © 2026 আজকের জাগরণ All rights reserved.