
দুই ছেলের অসুস্থতায় বিপর্যস্ত পরিবার, বড় ছেলের মৃত্যুতে শোকের মাতম; আইসিইউতে ছোট ভাই
এক রাত আগেও বাবার সঙ্গে কথা হয়েছিল ১০ বছরের নুর মোহাম্মদ আরাফাতের। বাবা মোহাম্মদ কবিরের ডাকে সাড়া দিয়ে সে বলেছিল, ‘আমি ভালো আছি।’ কিন্তু সেই কথোপকথনই যে বাবা-ছেলের শেষ কথা হয়ে থাকবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি কেউ। হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ পর্যন্ত মারা গেছে শিশুটি। আরাফাতের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই পরিবারটির সামনে দেখা দিয়েছে আরও বড় দুশ্চিন্তা। একই ধরনের অসুস্থতায় আক্রান্ত তার ১০ মাস বয়সী ছোট ভাই মোহাম্মদ আবু বক্কর আরব এখন চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে রয়েছে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বড় ছেলেকে দাফন করে হাসপাতালে ফিরে আসেন বাবা কবির। একদিকে সন্তানের মৃত্যুর শোক, অন্যদিকে ছোট ছেলের জীবন বাঁচানোর আকুতি—সব মিলিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ৩১ বছর বয়সী এই বাবা। চিকিৎসকেরা ছোট শিশুটির সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবু শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরে আইসিইউর সামনে অপেক্ষা করছেন তিনি।
কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন আগে বড় ছেলে আরাফাতের জ্বর, বমি ও কাশি শুরু হয়। প্রথম দিকে অসুস্থতা সাধারণ মনে হলেও ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে তাকে একাধিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয় শিশুটিকে।
কিন্তু দীর্ঘ চিকিৎসার ব্যয় বহন করা পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় আরাফাতকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ফুসফুস ও লিভারে জটিলতা দেখা দেয়। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে থাকার পরও শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
বাবা কবিরের কাছে ছেলের শেষ মুহূর্তের স্মৃতি এখন সবচেয়ে বেদনাদায়ক হয়ে আছে। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর সঙ্গে আরাফাতের শেষ কথা হয়। সেদিন বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে ছেলে জানিয়েছিল, সে ভালো আছে। পরদিন শুক্রবার সকালে ওষুধ আনতে হাসপাতালের বাইরে গিয়েছিলেন কবির। এর মধ্যেই চিকিৎসকের ফোন পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই থেমে যায় আরাফাতের জীবনের স্পন্দন।
পরিবারটির দুর্ভোগ এখানেই শেষ হয়নি। বড় ছেলে আরাফাতের মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগে ছোট ছেলে আবু বক্কর আরবকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তার শারীরিক অবস্থারও উন্নতি হয়নি। বর্তমানে শিশুটি আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। বড় সন্তানকে হারানোর পর ছোট সন্তানের জীবন নিয়েও গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের।
দুই সন্তানের অসুস্থতা ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে পরিবারটি। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা চালাতে গিয়ে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন কবির। একদিকে বড় ছেলের মৃত্যুর শোক, অন্যদিকে ছোট ছেলেকে বাঁচানোর ব্যাকুলতা—এই পরিস্থিতিতে পরিবারটির স্বাভাবিক জীবনযাপনও ভেঙে পড়েছে।
বড় ছেলের মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন মা আমেনা বেগম। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্বাভাবিক আচরণ করতে পারছেন না। কখনো বাড়িতে ছেলেকে খুঁজছেন, আবার কখনো শোক ও মানসিক বিপর্যয়ে জ্ঞান হারাচ্ছেন। সন্তানের মৃত্যুর বাস্তবতা যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
হাসপাতালের আইসিইউর সামনে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন বাবা কবির। তাঁর আকুতি, ‘আমি শেষ হয়ে গেলাম। আমার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেছে।’
একটি পরিবারের জীবনে এমন বিপর্যয় যে কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে, কবির ও আমেনা বেগমের বর্তমান পরিস্থিতি তারই নির্মম উদাহরণ। বড় সন্তানকে হারিয়ে শোকের ভারে নুয়ে পড়া পরিবারটি এখন ছোট সন্তানের সুস্থতার অপেক্ষায় রয়েছে। চিকিৎসার ব্যয়, ঋণের চাপ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে তাদের একমাত্র চাওয়া—ছোট ছেলেটি যেন ফিরে পায় সুস্থ জীবন।
সূত্র -টাইমস টুডে
সম্পাদক : নূর আলম শেখ
ঠিকানা: ফরিদ মিয়া কমপ্লেক্স, মুকসুদপুর, গোপালগঞ্জ।
ইমেইল : ajkerjagaran@gmail.com
news@ajkerjagaran.com
Copyright © 2026 আজকের জাগরণ All rights reserved.